ইনফান্তিনোর বিতর্কিত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল AFC: বিশ্বকাপ ‘বিক্রি’ করার পরিকল্পনায় বড় ধাক্কা

ইনফান্তিনোর বিতর্কিত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল AFC: বিশ্বকাপ ‘বিক্রি’ করার পরিকল্পনায় বড় ধাক্কা

ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় আয়োজক বিশ্বকাপ। কিন্তু এই বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব কি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করা উচিত? ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো যে প্রস্তাব দিয়েছেন, তা নিয়ে এখন তুমুল বিতর্ক চলছে। সম্প্রতি এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (AFC) এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। এর ফলে ইউরোপ (UEFA) ও উত্তর-মধ্য আমেরিকা-ক্যারিবীয় (CONCACAF)-এর পর এশিয়াও ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিল।

ঠিক কী প্রস্তাব দিয়েছেন ইনফান্তিনো?

ইনফান্তিনো বিশ্বকাপ ও ফিফার অন্যান্য প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক কার্যক্রম ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (FFE) নামে একটি নতুন প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে চান। এই প্রতিষ্ঠানের মোট মূল্য ধরা হচ্ছে প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর ২০ শতাংশ মালিকানা বিক্রি করা হবে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে।

এই বিনিয়োগের মূল ভূমিকায় থাকবে জোশুয়া কুশনারের নিউ ইয়র্ক-ভিত্তিক বিনিয়োগ সংস্থা Thrive Capital। জোশুয়া হলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই। প্রস্তাবটি বাস্তবায়নে সহায়তা করবে জেপি মורגান ব্যাংক

ইনফান্তিনো ইতিমধ্যে ফিফার ২১১টি সদস্য দেশকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন, এই প্রস্তাবে সম্মত হলে প্রতিটি সদস্য দেশ ২০ মিলিয়ন ডলার পাবে। আর পরবর্তী চক্রে তা ২২ মিলিয়ন ও ২৪ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে। তবে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে তারা আগের মতো ১০ মিলিয়ন ডলার পাবে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ১৯ সেপ্টেম্বর সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে

কেন এই প্রস্তাব এত বিতর্কিত?

ইনফান্তিনো বলছেন, এই উদ্যোগ ফুটবলের উন্নয়নে আরও তহবিল জোগাবে। কিন্তু বিরোধীরা বলছেন, বিশ্বকাপ বিক্রি করার এই প্রয়াস ফুটবলের ‘আত্মাকে’ হুমকির মুখে ফেলছে।

সমস্যা হচ্ছে, ইনফান্তিনো এই প্রস্তাব নিয়ে কোনো মহাদেশীয় ফুটবল সংস্থার সঙ্গে যথাযথ আলোচনা করেননি। AFC-এর সভাপতি শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল খলিফা এই বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, এটি “সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য”

AFC-এর অবস্থান: ‘আমাদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি’

৩০ জুলাই AFC-এর সভাপতি শেখ সালমান এশিয়ার ৪৭টি সদস্য দেশের ফেডারেশনকে একটি চিঠি পাঠান। সেখানে তিনি বলেন:

“AFC এই প্রস্তাবের বিষয়ে ফিফার কাছ থেকে কোনো পর্যায়েই কোনো ধরনের পরামর্শ বা আলোচনা পায়নি। প্রস্তাবের কোনো বিস্তারিত শাসনতান্ত্রিক, আর্থিক বা আইনি বিশ্লেষণও AFC-কে দেওয়া হয়নি—যা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।”

শেখ সালমান আরও বলেন, ফিফার এই একতরফা পদক্ষেপ মহাদেশীয় ফুটবলের ভিত্তিই নষ্ট করছে—যা সংহতি, সহযোগিতা ও স্বচ্ছতার ওপর নির্মিত। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের জন্য এত কম সময় কেন দেওয়া হচ্ছে?

তিন মহাদেশীয় জোট: ১৩৭টি দেশ ইনফান্তিনোর বিপক্ষে

উয়েফা তাদের জরুরি ভার্চুয়াল সভায় সর্বসম্মতিক্রমে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এই প্রস্তাব কার্যকর থাকলে তারা ফিফার কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে না। প্রভাব পড়তে পারে সেপ্টেম্বরের নারী অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ ও ব্রাজিলের নারী বিশ্বকাপেও।

কনকাকাফ তাদের ৪১টি সদস্য নিয়েও প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বলেছে, যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া এবং ফিফার নিজস্ব প্রশাসনিক সংস্থার পর্যালোচনা ছাড়া এই সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। তবে তারা উয়েফার মতো বয়কটের হুমকি দেয়নি।

এএফসি তাদের ৪৭ সদস্য নিয়ে এই জোটে যোগ দিয়েছে। তাদের ভাষ্য:

“AFC উয়েফা ও কনকাকাফের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করছে। ফিফার পতাকাঝরা প্রতিযোগিতায় বেসরকারি বিনিয়োগ আনার প্রস্তাব এবং FFE-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে আমাদের গভীর উদ্বেগ রয়েছে।”

তারা আরও বলেছে, এই প্রস্তাব “প্রয়োজনীয় বিস্তৃত ঐকমত্য ও ঐক্য অর্জন করতে পারবে না”

গণিত: উয়েফার ৫৫টি, কনকাকাফের ৩৫টি (কারণ তাদের ৪১ সদস্যের মধ্যে ৩৫টি ফিফার সদস্য) ও AFC-এর ৪৭টি ভোট—মোট ১৩৭টি দেশ ইনফান্তিনোর প্রস্তাবের বিপক্ষে। অথচ প্রস্তাব পাস করতে প্রয়োজন মাত্র ১০৬টি ভোট। তাই এই প্রস্তাব এখন কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে

ইনফান্তিনোর শিবিরে ফাটল: শীর্ষ উপদেষ্টার পদত্যাগ

এই বিতর্কের জেরে ইনফান্তিনোর শীর্ষ উপদেষ্টা কার্লোস কোরদেইরো পদত্যাগ করেছেন। তিনি ৪ বছর ১১ মাস ফিফার সিনিয়র উপদেষ্টা ছিলেন

কোরদেইরো বলেছেন, এই প্রস্তাব “ফুটবলের ভবিষ্যৎ বন্ধক রেখেছে” এবং এটি “ফুটবলের জন্য খারাপ চুক্তি”। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন:

“কেন এই চুক্তি? কেন এখন? কোন তদারকি আছে? কারা উপকৃত হবে? এই প্রশ্নগুলোর এখনও উত্তর নেই। অথচ সদস্য দেশগুলোর সামনে মাত্র ৫০ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ দেওয়া হচ্ছে।”

বিশ্বকাপ বয়কটের হুমকি

উয়েফা স্পষ্ট বলেছে:

“উয়েফা এবং এর জাতীয় সংস্থাগুলো ফিফার কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে না, যতক্ষণ না এই প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হয়।”

এর ফলে জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, স্পেনের মতো শক্তিশালী দলগুলো বিশ্বকাপে না খেলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। AFC অবশ্য এখন পর্যন্ত বয়কটের হুমকি দেয়নি, কিন্তু তারা ফিফাকে শাসন ব্যবস্থা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া জরুরি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে

ফিফার জবাব: ‘কেউ ফুটবল বিক্রি করছে না’

বিরোধিতার মুখে ফিফা বলেছে, “কেউ ফুটবল বিক্রি করছে না”। তারা জানিয়েছে, FFE-তে ফিফার নিয়ন্ত্রণ থাকবে এবং এটি ফুটবলের উন্নয়নে আরও সম্পদ জোগাবে। তবে এই বক্তব্য দিয়ে বিরোধীদের সন্তুষ্ট করা যায়নি।

এর প্রভাব কী?

এটি ফুটবলের প্রশাসনিক ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত—যেখানে ফুটবলের তিনটি বৃহত্তম মহাদেশীয় সংস্থা একজোট হয়ে ফিফার শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইনফান্তিনো ২০২৭ সালে পুনর্নির্বাচনে যাবেন। এই বিতর্ক তার নেতৃত্বের ওপর বড় প্রশ্নচিহ্ন বসিয়েছে। অনেকের ধারণা, এই প্রস্তাব প্রত্যাহার না করলে ইনফান্তিনোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামও বলেছেন, “ফুটবল বিনিয়োগকারীদের সম্পত্তি নয়”

ভবিষ্যৎ কী?

ইনফান্তিনো হয়তো প্রস্তাব প্রত্যাহার করতে পারেন, অথবা সদস্য দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়াতে পারেন। তবে ১৩৭টি দেশের বিরোধিতার মুখে এই প্রস্তাব টেকানো সম্ভব নয় বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা

AFC তাদের বিবৃতিতে বলেছে:

“বিশ্বকাপ এবং ফুটবল itself পুরো বৈশ্বিক ফুটবল পরিবারের। তাদের ভবিষ্যৎ সবসময় সম্মিলিতভাবে গঠিত হতে হবে, এমন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যা সব মহাদেশ ও সদস্য দেশের কণ্ঠস্বর প্রতিফলিত করে।”

এখন দেখার বিষয়, ইনফান্তিনো কি এই বিরোধিতাকে উপেক্ষা করে এগিয়ে যান, নাকি পিছু হটেন। ফুটবল বিশ্বের সবাই এখন ১৯ সেপ্টেম্বরের দিকে তাকিয়ে আছে।

ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় আয়োজক বিশ্বকাপ। কিন্তু এই বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব কি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করা উচিত? ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো যে প্রস্তাব দিয়েছেন, তা নিয়ে এখন তুমুল বিতর্ক চলছে। সম্প্রতি এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (AFC) এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। এর ফলে ইউরোপ (UEFA) ও উত্তর-মধ্য আমেরিকা-ক্যারিবীয় (CONCACAF)-এর পর এশিয়াও ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিল। ঠিক…

ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় আয়োজক বিশ্বকাপ। কিন্তু এই বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব কি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করা উচিত? ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো যে প্রস্তাব দিয়েছেন, তা নিয়ে এখন তুমুল বিতর্ক চলছে। সম্প্রতি এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (AFC) এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। এর ফলে ইউরোপ (UEFA) ও উত্তর-মধ্য আমেরিকা-ক্যারিবীয় (CONCACAF)-এর পর এশিয়াও ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিল। ঠিক…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *